উল্কা কিঃ
প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ উল্কাকে এক রহস্যাবৃত বস্তু হিসেবে কখনও ছুটন্ত তাঁরা, ধোঁয়া, বজ্র বা সনিক বোম হিসেবে দেখে আসছে । কখনও আবার সৃষ্টিকর্তার উপহার বা বিশেষ ক্ষমতাধর উৎস হিসেবে ধর্মীয় সম্মান দেখিয়েছে। এ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইতিহাস ২০০ বছরেরও কম। উল্কা হল পাথর বা ধাতব খণ্ড যা আকাশ থেকে পড়ে। ভু-পৃষ্ঠে পড়ার আগে বড় বস্তু ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। এর আকার মিলিমিটারের ভগ্নাংশ থেকে ফুটবলের আকার বা তার চেয়েও বড় আকারে হয়ে থাকে।
পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ জনিত কারণে এদের গতি প্রতি সেকেন্ড ১৮.৬ কি.মি. এরও বেশি হতে পারে। অপেক্ষাকৃত পৃথিবীর অধিক ঘনত্বের বায়ু মণ্ডলে প্রবেশের ফলে ঘর্ষণ ও আগুন ধরা জনিত কারণে অতি দ্রুত গতি কমে যায়, ফলে পৃথিবীতে আঘাত করার আগেই অধিকাংশ উল্কা আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আকারে ভূ-পৃষ্ঠে পড়ে।
আমাদের সৌরজগতের মার্স ও জুপিটার এর মধ্যবর্তী কক্ষে হাজার হাজার বিভিন্ন আকৃতির পাথর রয়েছ যা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। এগুলো প্রায় ৪,৫৬৮ মিলিয়ন বছর আগে তৈরি হয়েছে। কখনও দুটির মধ্যে ঘর্ষণের ফলে পৃথিবীর কক্ষপথে ঢুকে পরে। অল্প কিছু উল্কা আবার চাঁদ বা মার্স থেকে আসে। এগুলোর বয়স অপেক্ষাকৃত বেশ কম।
যদিও অনেক উল্কাই মাটিতে পড়তে দেখা যায় না আবার অধিকাংশই পড়ে সমুদ্রে, তবুও বছরে প্রায় হাজারটির মত দেখতে পাওয়া যায়। পৃথিবীর যে কোন জাগাতেই উল্কা দেখা যেতে পারে, তবে শুকনো এলাকা যেমন মরু অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ; কারণ গাছ-পালা, ঝুপ-ঝাড় কম থাকায় সহজেই হারিয়ে যায় না।
Cosmo রসায়নবিদ হিসেবে বিজ্ঞানীরা উল্কার এই ক্ষুদ্র অংশের রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করে এর জীবন ইতিহাস উদ্ঘাটন করতে পারেন।
উল্কার প্রভাবঃ
![]() |
| উল্কার প্রভাবে সৃস্ট গর্ত |
যখন এটা মাটিতে আঘাত করে তখনই কেবল এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। গ্রহ সৃষ্টির সময় অবশিষ্ট প্রহাণু ঘুরতে ঘুরতে যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন ছুটন্ত তারার মত এরা মাটিতে আঘাত করে। এর আঘাতের প্রচণ্ডতা নির্ভর করে এর আকারের উপর, কারণ ছোট উল্কা পিণ্ড পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এসে এর গতি কমে যায় এবং বড় ধরনের কোন ক্ষতি ছাড়াই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভু-পৃষ্ঠে আঘাত করে।
উল্কার প্রকারভেদঃ
লৌহ উল্কাঃ লৌহ উল্কার প্রায় পুরাটাই মেটালের। অধিকাংশই আয়রন-নিকেল দিয়ে তৈরি যার সাথে সামান্য সালফাইড ও কার্বাইড থাকে।
পাথুরে-লৌহ উল্কাঃ পাথুরে-লৌহ উল্কার অর্ধেকটা মেটাল ও অর্ধেকটা সিলিকেট ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ আয়রন-নিকেল ও সিলিকেট মিনারেল থাকে। এ ধরনের উল্কা পিন্ড দেখতে খুব সুন্দর হয়।
পাথুরে উল্কাঃ এগুলো সিলিকেট মিনারেল দিয়ে তৈরি। যত উল্কা পৃথিবীতে পড়ে তার অধিকাংশই পাথুরে।
উল্কা সংগ্রহঃ
প্রতি বছর যত উল্কা পৃথিবিতে আঘাত করে তার খুব অল্প সংখ্যকই মানুষ দেখতে পায়; বাকি অধিকাংশই সমুদ্রে বা বনে-জঙ্গলে হারিয়ে যায়। এযাবৎ সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪৫,০০০ উল্কা সংগ্রহ করা হয়েছ।
প্রতি বছর ২০ গ্রাম বা তার বেশি ওজনের প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৮০,০০০ হাজার উল্কা পৃথিবীতে পড়ে।
![]() |
| নামিভিয়ান মরুতে প্রাপ্ত উল্কা |
![]() |
| নোলাবর মরুতে প্রাপ্ত উল্কা |
অস্ট্রেলিয়ার নোলারবর ও আফ্রিকার সাহারা মরু অঞ্চল উল্কা খুঁজার জন্য উৎকৃষ্ট স্থান। অধ্যবদি প্রাপ্ত উল্কার অধিকাংশই সংগ্রহ করা হয়েছে এ্যন্টারটিক্যা অঞ্চল থেকে।
একটি উল্কাকে পৃথিবীতে আসার আগে অনেক দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হয় যার বহু চিহ্ন এর মধ্যে সংযোজিত হয়; আর এ থেকে বিঞ্গানীরা সহজেই স্থানীয় পাহাড়ি পাথর ও মানব তৈরি মেটাল থেকে উল্কা পিন্ডকে পৃথক করে ফেলে।
সম্প্রতিক কালের উল্কাঃ
২০১৩ সালের ১৫-ই ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের উড়াল এলাকায় এক বৃহত্ উল্কা আঘাত করে যার গতি ছিল ঘণ্টায় ৬৬,৯৫০ কি.মি. যা শব্দের গতির প্রায় ৬০ গুণ। উল্কাটি বিস্ফোরণের ক্ষমতা ছিল প্রায় ৪৪০,০০০ টন অব টি এন টি, অর্থাৎ জাপানের হিরোশিমার আণবিক বোমার ২০-৩০ গুণ বেশি। কিন্তু ভূমি থেকে প্রায় ৭৬,০০০ ফুট উপরে বিস্ফোরিত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে মাটিতে পড়ে; ফলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম। এতে প্রায় ১৫০০ লোক আহত হয় যার অধিকাংশই ঘর-বাড়ির জানাল-দরজার কাঁচ ভাঙ্গা জনিত কারণে।
![]() |
| রাশিয়ার উড়াল এলাকর আকাশে উল্কা |








