পিঁপড়ের সামাজিকতা



পিঁপড়ে সামাজিক জীব


দক্ষিণ এমেরিকার সৈন্য পিঁপড়ে যাদের সংখ্যা প্রতি কলোণীতে প্রায়  ৭০,০০০ হয়ে থাকে

পিঁপড়ে সামাজিক জীব। এদের পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায়ই  পাওয়া যায়। স্বল্পপরিসরে অল্প কয়েক ডজন মিলে বাস করতে পারে আবার কয়েক মিলিয়ন- বিরাট এলাকা জুড়েও বাস করতে পারে। কিন্তু এদের সামাজিক বন্ধন ও কার্যক্রম বেশ সুশৃঙ্খল।

সম্প্রতি গবেষণায় পিঁপড়ের জীবন যাত্রার অনেক ঘটনা মানুষের জীবন যাত্রার সাথে অনেক মিল পাওয়া যায়-



  • পিঁপড়ে তাদের মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখে।
  •  সুশৃঙ্খলার সহিত সামর্থ অনুযায়ি কাজের দ্বায়ত্ব বন্টন করে কাজ করে।
  • একে অন্যের সাথে সুন্দর যোগাযোগ রক্ষা করা, এমনকি খোঁষগল্প  বা চ্যাটিং করে।
  • প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র একে অন্যের সাথে অদল-বদল করা, ইত্যাদি।

 প্রায়শই এদের মালামাল বহন করতে দেখা যায় যা এদের শরীরের ওজনের প্রায় ২০ গুণ পর্যন্ত ভারী হতে পারে।গবেষণা থেকে এত ভারী বস্তু বহনের রহস্য জানা যায়।  এদের কাঁধ বিশেষ ভাবে তৈরি যা এত ভারী বস্তু বহনের ভারসাম্য রক্ষা করে। কোন ভারী বস্তু বহনের সময় সমস্ত শরীর ও বস্তুর ওজনের সম্মিলিত ভরকেন্দ্র থাকে ঠিক শরীরের যে অংশের সাথে পা সংযুক্ত থাকে সেখানে। ফলে পাহাড়সম ঢালু পথ উঠা বা নামা, কোন বস্তুর উপর দিয়ে ভারী বস্তু নিয়ে হাটার সময় কৌণিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারে।


 আকার অনুপাতে মানুষের সাথে পিঁপড়ের দৌড়নোর তুলনা করলে এরা ঘোড়ার মতো দৌড়ায়। একটি পিঁপড়ের ব্রেইনের সেল সংখ্যা প্রায় ২৫০,০০০; যেখানে মানুষের ১০,০০০ মিলিয়ন। অর্থাৎ কোন কলোণীতে ৪০,০০০ পিঁপড়ে থাকলে তাদের একত্রে একজন মানুষের ব্রেইনের সেলের আকারের সমান। 


পিঁপড়ের গড় আয়ু ৪৫-৬০ দিন। এদের গন্ধ সনাক্ত করারও শক্তি আছে। এদের মাথায় শক্ত দু'টো চোয়াল আছে যা কেঁচির মত খুলে-বন্ধ হয়। এরা খাদ্য চাবাতে বা গিলতে পারে না। তরল খাবার হিসেবে খাদ্যের রস খেয়ে শক্ত অংশ ফেলে দেয়। এদের দু'টি চোখ আছে যার প্রত্যেক চোখ আবার অনেকগুলো ক্ষুদ্র চোখের সমন্বয়ে গঠিত।এগুলোকে যৌগিক চোখ বলে।



পিঁপড়ের পেটে দু'টি পাকস্থলি থাকে। একটা পাকস্থলি এর নিজের জন্য ব্যবহার হয় আর দ্বিতীয়টা অন্য পিঁপড়েদের সাথে খাদ্য ভাগাভগি করার জন্য ব্যবহার হয়। অন্যান্য পোকা-মাকড়ের মত এর শরীরের বহি:রাবরণও শক্ত হয় যাকে এস্কো-স্কেলিটন বলে।এর জীবন চক্রের প্রধাণ চারটি ধাপ হলোঃ ডিম, লার্ভা (শুককীট), পোপা ও এডাল্ট (প্রাপ্ত বয়ষ্ক)। জীব বিজ্ঞানের ভাষায় এদেরকে Hymenoptera Formicidae বলা হয়। জানামতে ১০.০০০ এরও  বেশি প্রকারের পিঁপড়ে চিহ্নিত করা হয়ছে।
পিঁপড়ের জীবন চক্রে


পিপঁড়ের উপনিবেশ সারা পৃথিবী জুড়ে, শুধুমাত্র এ্ন্টার্কটিকা ও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন বসবাস অনুপযোগী দ্বীপ ছাড়া। পিঁপড়ে বেশ পরিবেশ বান্ধব, স্থানীয় প্রাণীজ জৈবের প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ গঠনে ভুমিকা রাখে। সব পিঁপড়েই পরিবার বদ্ধ। পিঁপড়েরা পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে। কিছু শ্রমিক পিঁপড়ের জন্য কাজ নির্ধারন করা থাকে, তারা বাসার ভিতরের ময়লা বাসার বাহিরের নির্দিষ্ট আবর্জনা ফেলার স্থানে ফেলে আসবে। প্রত্যেক কলোণীর জন্য নিজস্ব ও পৃথক সুগন্ধি থাকে যা দ্বারা সহজেই পৃথক করা সম্ভব।




পিঁপড়েদের মধ্যে শুধুমাত্র রাণী ও বংশ বৃদ্ধিকারী স্রীরাই বংশবৃদ্ধি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে

পিঁপড়েদের মধ্যে শুধুমাত্র রাণী ও বংশ বৃদ্ধিকারী স্রীরাই বংশবৃদ্ধি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে কোন কোন পিঁপড়ের বাসায় একাধিক রাণী থাকে, যেখানে অন্য বাসায় কোন রাণীই থাকেনা। যে পিপড়ে কলোণীতে কোন রাণী নাই তাকে "গেমারগেট কলোণী" বলে। আর যে কলোণিতে রাণী আছে তাকে বলে "কুইন রাইট। পাখাওয়ালা পুরুষ পিঁপড়েকে বলা হয় "ড্রোন"।





অনেক প্রজাতি যেমন লাল পিঁপড়ের শুঙ-কাঁটা থাকে যা বাসা রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করে। সাধারনত কাল পিঁপড়ে ও গাছ পিঁপড়ের কোন শুঙ-কাঁটা থাকে না। কিন্তু তারা ফরমিক এসিড স্প্রে করে বিশ্রি গন্ধ ছড়াতে পারে। অনেক পাখি তাদের পাঁলকের ভিতর পিঁপড়ে রাখে যা ফরমিক এসিড স্প্রে করে এদেরকে উকুঁনের হাত থেকে রক্ষা করে।

মানুষের দীর্ঘদিনের ইতিহাস- তারা যুদ্ধ করার জন্য অনেক অর্থকড়ি খরচ করে সেনা বাহিনী পোষে থাকে। কোপেনহেগেন বিশ্ব বিদ্যালয়ের গবেষক জনাব রাসেল আদম এবার দেখলেন পিঁপড়েরাও ঠিক সে কাজটি করে।

কিছু পিঁপড়ে তাদের কলোনী রক্ষার জন্য বিশেষ ধরনের সৈন্য নিয়োগ করে, যারা আকারে বড় ও হিংস্র-ঠিক ভয়ানক অস্রধারির কাজ করে। সৈন্য পিঁপড়েরা সবসময় ঘোরাফেরা করতে থাকে। Ecitron Burchelli নামের দক্ষিণ এমেরিকার সৈন্য পিঁপড়ে যাদের সংখ্যা প্রতি কলোণীতে প্রায়  ৭০,০০০ হয়ে থাকে। এরা ডিম ও শুককীট লম্বা কলাম করে বহন করে থাকে। 




শ্রমিক পিঁপড়েকিন্তু কিছু ছত্রাক উত্পাদনকারী-Sericomyrmex  কৃষক পিঁপড়ে আছে যারা তাদের বাসায় পাতা ও নরম ‌উদ্ভিদ সংগ্রহ করে। পিঁপড়েরা পাতা সংগ্রহ করলেও তা খেতে পারে না। কারন তারা সেলুলাজ হজম করতে পারে না। ফলে পরবর্তীতে খাওয়ার জন্য  এর মধ্য মুখের লালা মিশিয়ে বিশেষ ধরনের ছত্রাক উত্পন্ন করে পুষ্টিকর খাবার তৈরি করে।  কিন্তু এরা খুবই দুর্বল,  হানাদার ও দস্যুরা এদের আত্রমণ করে থাকে।  আর  সৈন্য পিঁপড়েরা এদের রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে থাকে। 


শ্রমিক পিঁপড়েরা ডিম ও ছোট বাচ্চাগুলো বয়স অনুযায়ি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গ্রুপে সাজিয়ে রাখে। রাতের ঠান্ডা থেকে রক্ষা করার জন্য ডিম ও শুককীট গুলো বাসার অধিক গভীরে রাখে। আবার দিনের বেলা ডিম ও শুককীটগুলোকে বাসার উপরের স্তরে রাখে যাতে গরম থাকতে পারে। শ্রমিক পিঁপড়েরা কোন খাবারের সন্ধান পেলে গন্ধ ছড়িয়ে সংকেত প্রদান করে যাতে কলোণীর অন্যরাও খাবারের উত্স খোঁজে পায়।



পিঁপড়ের ডিম

পিঁপড়ের ডিম
Megalomyrmex symmetochus নামক এক ধরনের পিঁপড়ে Sericomyrmex পিঁপড়ের কলোণীর ভিতরে রাণী ও শ্রমিক পিঁপড়ে নিয়ে  আলাদা একটা নিজস্ব কলোণী তৈরি করে। যার শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি কৃষকদের বাসা। এটা দেখতে অনেকটা প্যারাসাইট আকারের। এরা নিজেরা কোন খাদ্য তৈরি করে না, কৃষকদের তৈরি ছত্রাক খেয়ে থাকে। কৃষকদের কিছু শুককীটও এরা খেয়ে ফেলে এবং তরুনী রাণীর ডানা ভেঙ্গে ফেলে যাতে এরা কলোণি ছেড়ে উরে গিয়ে অন্য কোন কলোণী না গড়তে পারে।

কিন্তু Megalomyrmex symmetochus রা সবসময় পুরাপুরি সফল হয় না।  Gnamptogenys hartmani নামের  ছয় পা ওয়ালা দস্যু পিঁপড়ে প্রায়ই Sericomyrmex দের বাসায় আক্রমণ করে। কৃষক পিঁপড়েদের বাসায় হানা দিয়ে তদেরকে বাসা থেকে বের করে দেয় এবং অবশিষ্ট শুককীট খেয়ে ফেলে। কৃষক পিঁপড়েরা এদর বিরুদ্ধে খুব সামান্য কিছুই করতে পারে। কারন তাদের বিশেষ প্রশিক্ষিত সৈন্য নাই,  যাও আছে তাদের আবার শুঙ-কাঁটা ইতিমধ্যেই ভেঙ্গে গেছে। এরা শক্তিশালি মুখ দিয়ে কামড়ে দিতে পারে, কিন্তু এই বদ্ধ ঘরে নিজেদেরকে কামড় খাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অধিকাংশ সময়ই উড়ে পালায় বা মারা পড়ে। অতপর Megalomyrmex symmetochus রা তাদের কলোনীতে অবশিষ্ট থাকে।




আরও পড়তে পারেনঃ

No comments:

Post a Comment

WAZIPOINT:
Thank you very much to visit and valuable comments on this blog post. Keep in touch for next and new article. Share your friends and well-wisher, share your idea to worldwide.